সমুদ্রপ্রেমী ও রোমাঞ্চপ্রিয় তরুণদের কাছে আন্তর্জাতিক জাহাজে বা মার্চেন্ট নেভিতে চাকরি সবসময়ই একটি লোভনীয় ও আকর্ষণীয় পেশা। প্রচলিত ৯টা-৫টার চাকরি থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্ব বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে কারго জাহাজ, কন্টেইনার ভেসেল, অয়েল ট্যাংকার বা ক্রুজ শিপগুলো সাগরে যে ভূমিকা রাখে, তার মূল চালিকাশক্তি হলো এই জাহাজের কর্মীরা।
আপনি যদি আন্তর্জাতিক জাহাজে ক্যারিয়ার গড়ার কথা ভেবে থাকেন, তবে এর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, বেতন এবং সার্বিক ক্যারিয়ার গাইডলাইন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া জরুরি।
১. আন্তর্জাতিক জাহাজে কাজ করার বিভাগ ও পদসমূহ
জাহাজে বিভিন্ন বিভাগে জনবল নিয়োগ করা হয়। প্রধান বিভাগগুলো হলো:
ডেক ডিপার্টমেন্ট (Deck Department):
জাহাজের নেভিগেশন, চলাচল এবং কার্গো বা পণ্য লোড-আনলোড তদারকির দায়িত্বে থাকে এই বিভাগ। পদবিন্যাস: ডেক ক্যাডেট (Deck Cadet) দিয়ে শুরু হয়ে থার্ড অফিসার, সেকেন্ড অফিসার, চিফ অফিসার এবং পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন বা মাস্টার পর্যন্ত উন্নীত হওয়া যায়।
ইঞ্জিন ডিপার্টমেন্ট (Engine Department):
জাহাজের মূল ইঞ্জিন, জেনারেটর এবং অন্যান্য যান্ত্রিক সরঞ্জামের অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে এই বিভাগ। পদবিন্যাস: ট্রেইনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার বা ফিফথ ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে ফোর্থ, থার্ড, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হয়ে চিফ ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায়।
ইলেক্ট্রো-টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (ETO): আধুনিক জাহাজের ইলেকট্রনিক্স, অটোমেশন ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য ইটিও (ETO) বা ইলেকট্রো-টেকনিক্যাল অফিসার নিয়োগ করা হয়।
ক্যাটারিং বা জেনারেল সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট: জাহাজে কর্মরত ক্রুদের খাবার তৈরি ও পরিবেশন এবং কেবিন পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে থাকে এই বিভাগ।
পদগুলোর মধ্যে রয়েছে চিফ কুক, স্টিওয়ার্ড ইত্যাদি।
২. প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা
পেশাভেদে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়সের ভিন্নতা রয়েছে:
অফিসার লেভেল (ডেক ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার):
সাধারণত বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতসহ (PCM) ন্যূনতম উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের পাস হতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বা নটিক্যাল সায়েন্সে বিএসসি বা ডিপ্লোমা ডিগ্রি থাকতে হয়।
ইংরেজিতে ভালো দক্ষতা থাকতে হবে, কারণ আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সেক্টরে যোগাযোগের মাধ্যম ইংরেজি।
রেটিংস বা জেনারেল পারপাস (GP) কোর্স:
সাধারণ গ্রেডে বা রেটিংস হিসেবে যোগ দিতে হলে ন্যূনতম এসএসসি (মাধ্যমিক) পাস এবং সাথে ইংরেজি ও অন্যান্য বিষয়ে নির্দিষ্ট জিপিএ থাকতে হয়।
বয়সসীমা: সাধারণ ১৬.৫ থেকে ২৫ বছর বা ক্ষেত্রবিশেষে ২৮ বছরের মধ্যে আবেদন করতে হয়।
শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত ফিটনেস:
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম নিয়ম অনুযায়ী প্রার্থীকে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে হয়।
দৃষ্টিশক্তি সাধারণত ৬/৬ (চশমা ছাড়া) এবং কালার ব্লাইন্ডনেস বা বর্ণান্ধতা থাকলে সাধারণত অযোগ্য বলে গণ্য করা হয়।
৩. আবশ্যিক ট্রেনিং ও সার্টিফিকেট
জাহাজে চড়ার আগে কিছু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ট্রেনিং সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক:
STCW ট্রেনিং: বেসিক সেফটি ট্রেনিং (BST), ফায়ার ফাইটিং, ফার্স্ট এইড এবং পারসোনাল সারভাইভাল টেকনিকস।
CDC (Continuous Discharge Certificate): সামুদ্রিক সেবার রেকর্ড বুক বা সিডিসি সংগ্রহ করতে হয়।
COC (Certificate of Competency):
নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা ও সি-টাইম (Sea Time) অর্জনের পর যোগ্যতা অনুযায়ী কম্পিটেন্সি সার্টিফিকেট অর্জন করতে হয়।
৪. বেতন ও সুযোগ-সুবিধা
আন্তর্জাতিক শিপিং সেক্টরে বেতনের বিষয়টি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, যা সাধারণত মার্কিন ডলারে (USD) প্রদান করা হয়:
এন্ট্রি লেভেল (ক্যাডেট বা রেটিংস): পদ ও কোম্পানির ওপর ভিত্তি করে শুরুর দিকে মাসিক বেতন বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৭০,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে।
অফিসার লেভেল (থার্ড/সেকেন্ড অফিসার বা ইঞ্জিনিয়ার): অভিজ্ঞতা বাড়লে এই পদে বেতন লাখ টাকা ছাড়িয়ে কয়েক লাখ টাকায় পৌঁছায়।
ক্যাপ্টেন বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার: অভিজ্ঞ ও সিনিয়র অফিসারদের মাসিক আয় আন্তর্জাতিক মানে অত্যন্ত লোভনীয় (কয়েক লক্ষ টাকা)।
অন্যান্য সুবিধা: জাহাজে থাকা-খাওয়া ফ্রি হওয়ায় বেতনের বড় অংশই জমানো সম্ভব। এছাড়া বিশ্ব ভ্রমণের সুযোগ, ট্যাক্স ফ্রি আয়ের সুবিধা এবং দীর্ঘ ছুটির সুযোগ রয়েছে।
৫. ক্যারিয়ার গাইডলাইন ও সতর্কতা
সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন: দেশ বা বিদেশের যে কোনো মেরিটাইম একাডেমি বা ইন্সটিটিউট থেকে কোর্স করুন না কেন, তা যেন সরকার বা সংশ্লিষ্ট মেরিটাইম অথরিটি অনুমোদিত হয়।
প্রতারণা থেকে সাবধান: মার্চেন্ট নেভিতে চাকরির নামে অনেক সময় কিছু অসাধু চক্র ভুয়া অফার দিয়ে থাকে। তাই যেকোনো এজেন্সিতে টাকা দেওয়ার আগে কোম্পানির বৈধতা ও লাইসেন্স ভালোভাবে যাচাই করুন।
ভাষা ও দক্ষতা: ইংরেজি বলা ও লেখার দক্ষtheতা বাড়ান এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে নিজেকে আপডেট রাখুন।
শেষ কথা: আন্তর্জাতিক জাহাজের চাকরি কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি রোমাঞ্চকর জীবনধারা। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এ
